মৌপালন সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। খুব স্বল্পপূজিঁতেই অর্থ উপার্জন করা যায় এ শিল্পে। মৌপালনে খুব দ্রুত স্বনির্ভর হয়ে ওঠা যায়। আজ আপনাদের সঙ্গে এ বিষয়েই আলোচনা করছি।
যেভাবে শুরু করবেনঃ
আপনি কিছু একটা করতে চান। কিন্তু কি করবেন এবং কিভাবে শুরু করবেন সেটা আপনাকে ভাবাচ্ছে। শুরু করতে পারেন মৌপালন। এটার জন্য আপনার প্রথমেই প্রয়োজন মৌপালন এবং মধু উৎপাদন সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ। যে কোন মৌখামারে হাতে কলমে এক সপ্তাহ শিখতে পারেন। এটা খুব কার্যকারী ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও বিসিক মৌপালন কর্মসূচি এ সম্পর্কিত পাঁচদিন মেয়াদের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে। বিসিক থেকেও নিতে পারেন প্রশিক্ষণ। মূলত মৌ কোলনী, মৌমাছির স্বভাব, মৌমাছির প্রজনন, পরিচর্যা, মধু উৎপাদন, মৌবক্স, মধু উৎপাদন কৌশল, রোগবালাই এসবই মৌপালনের জন্য জানা আবশ্যিক বিষয়। যে কোন মৌ খামারে এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ আপনাকে দারুণ ভাবে হাতে কলমে শেখাতে পারে।
এরপরই আপনার প্রয়োজন পড়বে মৌবক্স ও মৌকলনী। মৌকলনীগুলোতে যে মৌচাক থাকে তা সাধারণ ৮/১০ টি থাকে। মৌচাক সমূহ ক্রয় করতে হবে। প্রতি চাক মৌসুমে তথা মধু উৎপাদনকালে পাঁচশত থেকে আটশত টাকা দরে বিক্রি হয়। এক একটি মৌবাক্সে পাঁচ থেকে ছয়টি ফ্রেম নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেন। এক একটি মৌবাক্সে ৩০০০/৩৫০০ টাকা ব্যায়ে শুরু করা যায়। প্রথম পর্যায়েই বাণিজ্যিক উৎপাদনে না যেয়ে শিক্ষানবীশ ভাবে কিছু সময় কাজ করলে প্রকল্প আকারে মৌখামার স্থাপনে সফলতা আসে দ্রুত।
উৎপাদন ও বাজারঃ
মধু অন্য সব পণ্যের মত মানের উপর নির্ভর করে। মধুর মান উৎকৃষ্ট হলে তার চাহিদা সব সময়েই ভালো থাকে। মধু সাধারণত বাজারে ৪০০/৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এক একটি মৌবাক্স থেকে বছরে গড়ে ৬০-৮০ কেজি পর্যন্ত বাৎসরিক উৎপাদন করা যায়।
সরকারের অনুমোদনঃ
মধু খাদ্য উপাদান হওয়ায় এটির উৎপাদন ও বিপণণে প্রয়োজন অনুমোদন। খামার স্থাপনে রেজিষ্ট্রেশন প্রদান করে থাকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। অন্যদিকে মধু খোলা বাজারে বিপণনে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেষ্টিং ইনষ্টিটিউট (বিএসটিআই) অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে। তবে ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তির বিপণনে তেমন কোন সমস্যা হয়না। কারণ দেশের অধিকাংশ মৌখামারিরই খামার নিবন্ধন ও বিএসটিআই অনুমোদন নেই। তবে অনুমোদন নেয়া জরুরি।
বাৎসরিক উৎপাদন পরিকল্পনাঃ
বাৎসরিক উৎপাদন পরিকল্পনা খুব জরুরি। যদি জীবন ও জীবিকাকে কেন্দ্র করে মৌখামার স্থাপন করতে চান তবে আপনার মোট উৎপাদন কত প্রয়োজন, বিপণন কিভাবে করতে চান এবং এসবের জন্য আপনার কতগুলো মৌবাক্স প্রয়োজন সেটা খুব জরুরি। এজন্য বাৎসরিক উৎপাদন পরিকল্পনা খুব জরুরি।
মৌপালনে আবশ্যিক বিষয়ঃ
মৌপালনে আবশ্যিক বিষয় হলো ফুলের প্রাচুর্যতাময় অঞ্চলে থাকা। যেমনঃ ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার তাড়াশ, ভাঙ্গুরা, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ, হিলি এলাকায় প্রচুর সরিষা উৎপাদন হয়, শরিয়তপুর-মাদারিপুরে ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদিত হয় ধুনিয়া-কালোজিরা, মার্চে দিনাজপুর ও ঈশ্বরদিতে প্রচুর লিচু ফুলে মধু উৎপাদন করা যায়। এছাড়াও এপ্রিলে সুন্দরবনে উৎপাদিত হয় খলিশার মধু। এসব অঞ্চলে মধু উৎপাদনে আপনাকে তাবু স্থাপন করে মধু সংগ্রহ অভিযান পরিচালিত করতে হবে।
বর্ষকাল এবং অফসিজনঃ
বর্ষাকালে তেমন ফুল থাকেনা। এ সময়টি মোকাবিলা করা খুব জরুরি। মৌমাছিদের কৃত্রিম খাবার দিয়ে এ সময় প্রতিপালন করতে হয়। এর জন্য মোটা অংকের খরচ হয় এবং কোলনী দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্র মোকাবিলা করতে মোট উৎপাদনের ৩০% খরচ পড়ে। তাই বর্ষকাল ক্রান্তিকাল। এ সময়টি বেশি যত্নশীল হতে হয়।
সাহসিকতা এবং ধর্য্যঃ
সবক্ষেত্রেই যেমন সৎ সাহস এবং ধর্য্য প্রয়োজন একই ভাবে মৌপালনে এটি শতভাগ থাকতে হবে। মৌকলনী দুর্বল হয়ে পড়বে ধর্য্য নিয়ে সেটি শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে। রোগবালাই সংক্রমিত হলে ধর্য্য নিয়ে সেটি মোকাবিলা করতে হবে।
সব ঠিক থাকলে এটি সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। আপনার সাফল্য আসবে এবং আপনি দ্রুত স্বাবলম্বি হয়ে উঠবেন। আপনাকে পরিশ্রমি এবং দক্ষ হয়ে উঠতে হবে।
লেখকঃ
মোঃ মোসাদ্দেক হোসেন
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান
মোসাদ্দেক মৌখামার, Musaddek bee farm
ই-মেইলঃ musaddek1971@gmail.com
মোবাইলঃ 01738832141